খালেদা জিয়া বলেন, 'হামলা-মামলা দিয়ে কাজ হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষা কিভাবে দিতে হয় তা বিএনপিকে শেখাচ্ছেন। মামলা তো এখন দিচ্ছেন। বিএনপিকে শেখাচ্ছেন। আমরা শিক্ষা নিচ্ছি। তবে আপনাদের শিক্ষা দেব না। ইনশা আল্লাহ, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আপনারা যে লুটপাট করেছেন তার সব ডকুমেন্ট বের করে মামলা হবে। তখন দিন-রাত আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতেই দিন যাবে।'
আওয়ামী লীগকে ভণ্ড ও প্রতারক উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'তারা দেশ ও জনগণ নয়, বরং দল ও নিজেদের নিয়ে চিন্তা করে। দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হানাহানির সৃষ্টি করছে। গত দেড় বছর তারা ক্ষমতায়। অথচ বিএনপি তাদের বলেছে, আপনারা শান্তিতে দেশ চালান, আমরা সহযোগিতা করব। তাই এ সময় আমরা হরতাল-ধর্মঘটের মতো কোনো কর্মসূচি দেইনি। কিন্তু তারা দেশের কথা, জনগণের কথা বাদ দিয়ে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসে ব্যস্ত। তাদের দিয়ে দেশ ও জনগণের কোনো লাভ হবে না। তাদের ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়।'
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিতে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। এই আপাজান আমাদের কত শান্তিতে রেখেছেন! আমাদের সময় তেলের দাম একটু বাড়লেই তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়া জবাব চাই। এখন তেলের দাম ১০০ টাকা কেন_বুবুজানের কাছে জবাব চাই।'
বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেন, 'ভর্তুকি দিয়ে আমরা জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে জিনিসপত্রের দাম রাখতাম। অথচ সরকারের লোকেরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। তাদের একজন বাণিজ্যমন্ত্রী রয়েছেন, যিনি কাজের চেয়ে কথা বেশি বলেন। তিনি টিসিবির দামের চেয়ে বেশি দামে তাঁর এক আত্দীয়কে কাজ দিয়েছেন। বিএনপির সময়ের চেয়েও দুর্র্নীতি বেশি হচ্ছে_এটি কি তা-ই প্রমাণ করে না?'
বিএনপি নেত্রী বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। অথচ আওয়ামী লীগ বলে, বিএনপির সাত বছর। তিনি বলেন, বিএনপির সময় চালের সের ছিল ১৬-১৮ টাকা, ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের সময় ৪০ টাকা আর আওয়ামী লীগের সময় ৩০ টাকা। তারা বলেছিল, তাদের ভোট দিলে ১০ টাকা কেজি চাল দেবে। বিনামূল্যে সার দেবে। ক্ষমতায় গেলে ঘরে ঘরে চাকরি দেবে। এখন তারা অস্বীকার করছে। তিনি বলেন, 'আমি জানতে চাই, দেড় বছরে কতজনের চাকরি দিয়েছে? এখন তারা বলছে, ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়।'
খালেদা জিয়া বলেন, দেশে বিদ্যুৎ নেই। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিদ্যুতের দুর্ভিক্ষ। আসলে আওয়ামী লীগ মানেই দুর্ভিক্ষ। '৭৪ সালে এ দেশের মানুষকে ভাতে মেরেছে। বাসন্তী জাল পরেছিল। কলাপাতা দিয়ে মানুষকে দাফন করতে হয়েছিল। তিনি বলেন, প্রতিদিন মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু সরকার নীরব। নিজেরা মানুষ হত্যা করছে আর দায় চাপাচ্ছে বিএনপির ওপর। ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও তারা বন্ধ করে দিয়েছে। নিম্ন আদালতে নিজেদের লোক বসানো হয়েছে। তারা সরকারের ইঙ্গিতে চলতে বাধ্য হয়। মইন যেভাবে চালিয়েছে, এখনো তারা সেভাবেই চালাচ্ছে। উচ্চ আদালতের বিচারকরা সঠিক রায় দিতে পারেন না। সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমান ও শওকত মাহমুদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। নুরুল কবিরকেও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
খালেদা জিয়া বলেন, দলীয় লোকদের কাজ দেওয়ার জন্য আরেকটি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে সরকার, তা হচ্ছে বিনা টেন্ডারে দুই কোটি টাকার কাজ দেওয়ার প্রকল্প। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে খুলনার উন্নয়ন করা হবে। মংলা বন্দর দিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। মংলা বন্দর দিতে দেওয়া হবে না।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, 'এই দেশকে তাঁবেদার, অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা চলছে। এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে যাবে। তার আগেই এই সরকারকে বিদায় দিতে হবে। এত কিছু দেওয়ার পর তিন বিঘা করিডর আনতে পারলেন না। শুধু ব্যর্থতা, ব্যর্থতা, ব্যর্থতা।'
এদিকে সমাবেশে আসার পথে দুর্ঘটনায় নিহত কর্মীদের স্মরণে আজ সোমবার সারা দেশে শোক পালনের কর্মসূচি দেন খালেদা জিয়া।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির পরিচালনায় সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ড. আব্দুল মঈন খান, বেগম সারোয়ারী রহমান, সহসভাপতি সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, যুবদলের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, শাহ শরিফ কামাল তাজ, নুরুল ইসলাম দাদু, খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি মাজেদুল ইসলাম, খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান প্রমুখ।
সকাল ৮টায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর খুলনার উদ্দেশে রওনা দেয়। ঢাকা থেকে ধামরাই পর্যন্ত রাস্তার পাশে খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাতে কোনো নেতা-কর্মীকেই দেখা যায়নি। গাড়িবহর রাজধানীর গাবতলী পার হওয়ার পর মানিকগঞ্জ পেঁৗছালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানান। পাটুরিয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সমর্থকরা শোডাউন করে। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুন অর রশিদ খান মুন্নু ও তাঁর মেয়ে মহিলা দলের নেত্রী আফরোজা খান রীতা এবং তাঁদের সমর্থকরা খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানান ফেরিঘাটের চৌরাস্তায়। দেলোয়ার ও মুন্নুর দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রকাশ গতকালও দেখা গেল। ইঞ্জিনিয়ার টি এইচ আইয়ুবের সমর্থকরা শালিখা থেকে শুরু করে যশোর পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটারজুড়ে শোডাউন করেন।
আহতদের পাশে : মহাসমাবেশে যোগদানের পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দেখতে খালেদা জিয়া গত রাত সোয়া ৮টার দিকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি আহতদের খোঁজখবর নেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন খালেদা জিয়া।
এদিকে এক বিবৃতিতে তিনি দুর্ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গত রাতে দেওয়া শোকবার্তায় তিনি বলেন, 'দলের কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এই প্রাণহানিতে তাদের পরিবারকে সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।'
সমাবেশে যোগদানে বাধাদানের অভিযোগ : আরেক বিবৃতিতে বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করেছেন, খুলনায় বিএনপির মহাসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়া নেতা-কর্মীদের গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। বিবৃতিতে তিনি বলেন, মহাসমাবেশ সফল করতে বিভাগের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নড়াইল ও যশোরের শার্শায় মানুষের ঢল যখন বাসে-ট্রাকে করে খুলনার দিকে যাচ্ছিল, তখন আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আক্রমণ চালিয়ে গাড়ি ভাঙচুর এবং অসংখ্য মানুষকে আহত করে।
http://www.kalerkantho.com/